স্টাফ রিপোটারঃ
পর্যটকদের আবাসনের আড়ালে কক্সবাজারের হিমছড়ির একটি রিসোর্টে গড়ে উঠেছিল আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারণার একটি ‘সাইবার ল্যাব’। রিসোর্টের ছয়টি শব্দরোধী কক্ষ ও বড় হলরুমে বসানো হয়েছিল কম্পিউটার, মনিটর ও প্রায় দুই হাজার আইফোন। কনস্ট্রাকশন কোম্পানি প্রতিষ্ঠার নামে চক্রটি শুধু রিসোর্টই ভাড়া নেয়নি, পুরো নিয়ন্ত্রণও হাতে নিয়ে নিয়েছিল তারা। নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল নিজস্ব লোকবল ও সিকিউরিটি ব্যবস্থাও। চীনা ও তাইওয়ানিজ নাগরিকদের পরিচালিত ওই চক্রের ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের হিমছড়িতে মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্ট ছাড়াও উখিয়ার ইনানী এলাকার আরো দুটি রিসোর্ট ও একটি আবাসিক ভবন ভাড়া নিয়েছিল চক্রটি। পুলিশ বলছে, চলতি বছরের মার্চ থেকে এসব স্থানে তিন শতাধিক চীনা ও তাইওয়ানিজ নাগরিক অবস্থান করে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তবে তাদের সবাই চক্রটির সঙ্গে জড়িত কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
অভিযানে মেরিনা বিচ ভিলার সাইবার ল্যাব থেকে ১,৯৩৮টি পুরোনো মডেলের আইফোন, ৫০টি মনিটর, ৪৪টি সিপিইউ, ৩০টি কিবোর্ড, দুটি ল্যাপটপ, দুটি প্রিন্টার, ৪০টি মাউস, একটি আইপিএস ও ২৪টি কানেকশন বোর্ড জব্দ করা হয়।
এ ছাড়া চীনের দুটি জাতীয় পতাকা, চীনা পুলিশের দুটি র্যাংকব্যাজ, পুলিশ প্রতীকযুক্ত একটি টাই, চারটি গ্রামীণফোন ও একটি রবি সিম, ১৫টি নোটখাতা এবং একটি ডায়েরিও উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য, রিসোর্টটি ভাড়া নেওয়ার পর চক্রটি নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী এর অভ্যন্তরীণ কাঠামো পরিবর্তন করে। বড় হলরুমে তৈরি করা হয় কম্পিউটার ল্যাব এবং ছয়টি শব্দরোধী কক্ষ। রিসোর্টের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনাও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় তারা।
পুলিশের অনুসন্ধানে জানা যায়, ‘বাবর আলী’ নামে এক চীনা নাগরিক রিসোর্টগুলো ভাড়া নেওয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পুলিশ বলছে, তার প্রকৃত নাম ঝান ইউয়ান ফান। তার সহযোগী পাই লেডিং রিসোর্ট মালিকদের সঙ্গে ভাড়ার চুক্তি করেন।
আরেক চীনা নাগরিক উ ওয়েইপিং নিজেকে ‘জিন শিন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি’র মালিক হিসেবে পরিচয় দেন। বাংলাদেশে নির্মাণ কোম্পানি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া চলছে বলে তিনি দাবি করলেও পুলিশের অনুসন্ধানে ওই নামে কোনো কোম্পানির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
পুলিশের দাবি, বিদেশি নাগরিকদের অবস্থান ও রিসোর্ট ভাড়ার তথ্যও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যথাযথভাবে জানানো হয়নি। বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশিদের পাসপোর্ট ও ভিসার কপি সংশ্লিষ্ট বিশেষ শাখায় জমা দেওয়ার বিধান থাকলেও এসব নাগরিকের ক্ষেত্রে তা পাওয়া যায়নি।
পুলিশ সূত্র জানায়, চক্রটির সন্ধান পেতে তিন দফা অভিযান চালাতে হয়েছে। প্রথম দফায় গত ২৫ আগস্ট মেরিনা বিচ ভিলায় অভিযান চালানো হয়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে সেখানে থাকা কয়েকজন বিদেশি নাগরিক পেছনের সৈকত দিয়ে পালিয়ে যান। পরে রিসোর্টের হলরুম থেকে বিপুলসংখ্যক আইফোনসহ অন্যান্য সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। পরদিন ঢাকায় অবস্থিত চীনা দূতাবাসের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল রিসোর্টটি পরিদর্শন করে। তারা সাইবার ল্যাব, শব্দরোধী কক্ষ ও বিদেশি নাগরিকদের ব্যবহৃত বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখেন। ২৮ আগস্ট পুলিশের অপরাধ তদন্তের বিশেষায়িত ইউনিট সিটিটিসির উপমহাপরিদর্শকের নেতৃত্বে নয় সদস্যের একটি দল রিসোর্টটি পরিদর্শন করে।
পুলিশের এজাহারে বলা হয়েছে, সিটিটিসির প্রাথমিক মতামত অনুযায়ী, চক্রটি কৃত্রিম বাজার বিশ্লেষণ, ভুয়া প্রলোভন দেখানো, নকল বা ভুয়া বাণিজ্য প্ল্যাটফর্মে অর্থ জমা নেওয়া, ‘এক্সিট ফ্রড’ ও অর্থ আত্মসাতের মতো অনলাইন আর্থিক প্রতারণায় জড়িত থাকতে পারে। তবে প্রকৃত কর্মকাণ্ড নিশ্চিত করতে জব্দ করা আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা প্রয়োজন।
মেরিনা বিচ ভিলায় অভিযানের পর কয়েকজন বিদেশি নাগরিক কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন হোটেলে অবস্থান করছেন—এমন তথ্য পায় পুলিশ। পরে কলাতলী এলাকার দুটি আবাসিক হোটেলে অভিযান চালিয়ে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলেন, তাইওয়ানের ওয়েই ছিং ওয়েন এবং চীনের সু ইয়াংফান, ইয়ান চ্যাংশেং, সু হাইয়াং, উ চিয়ানশিয়ং ও ঝাং ঝেমিং। তাদের কাছ থেকে ছয়টি মোবাইল ফোন, পাঁচটি পাসপোর্ট ও তিনটি পরিচয়পত্র জব্দ করা হয়। পলাতক চারজন হলেন ঝান ইউয়ান ফান ওরফে বাবর আলী, পাই লেডিং, উ জিপিং ও জিয়ান ঝাং।
এই ঘটনায় রামু থানার পুলিশ পরিদর্শক মিন্টু দত্ত বাদী হয়ে গত বৃহস্পতিবার সাইবার অপরাধ আইনে মামলা করেছেন। মামলায় গ্রেপ্তার ছয়জন, পলাতক চারজনের পাশাপাশি ২৫০ থেকে ৩০০ জন চীনা ও তাইওয়ানিজ নাগরিককে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।
পুলিশ বলছে, কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন কয়েকটি রিসোর্টে দুই থেকে তিন শতাধিক চীনা ও তাইওয়ানিজ নাগরিক অবস্থান করছিলেন। তাদের সবাই কথিত অপরাধের সঙ্গে জড়িত, নাকি একটি অংশকে ব্যবহার করে নেটওয়ার্ক পরিচালনা করা হচ্ছিল—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ বলছে, কক্সবাজার জেলা বিশেষ শাখার (ডিএসবি) গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে রামু উপজেলার হিমছড়ির মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্ট এবং উখিয়ার ইনানী এলাকার ড্রিম হলিডে রিসোর্ট, অর্কিড-ব্লু রিসোর্ট ও ইলিয়াস ব্রাদার্স নামের আবাসিক ভবনে বিপুলসংখ্যক চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিকের অবস্থানের বিষয়টি সামনে আসে।
রামু থানার ওসি এ কে ফজলুল হক বলেন, বিদেশিরা কী উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে এসেছিলেন, রিসোর্টে কী ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন এবং ‘জিন শিন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি’র দাবির পক্ষে বৈধ কাগজপত্র আছে কি না—এসব বিষয় তদন্ত করা হচ্ছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) অহিদুর রহমান বলেন, ঢাকা থেকে পাওয়া সুনির্দিষ্ট তথ্য ও রামু থানায় করা অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ ও আন্তর্জাতিক অনলাইন আর্থিক প্রতারণার অভিযোগে মামলা হয়েছে।
গত শুক্রবার বিকেলে গ্রেপ্তার ছয়জনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, পলাতকদের গ্রেপ্তার এবং পুরো নেটওয়ার্কের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
এ বিষয়ে সর্বশেষ অবস্থা জানতে কক্সবাজার পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) অহিদুর রহমানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মোহাম্মদ অহিদুর রহমান জানান, তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে পারবেন না। তার ওপর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিষেধ রয়েছে।
চীনা নাগরিকদের হোটেল ভাড়া দেওয়া এবং তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে না জানানোর বিষয়ে জানতে মেরিনা বিচ ভিলাস রিসোর্ট ও ইনানীর ড্রিম হলিডে রিসোর্টের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাদের সব মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।
তবে, হোটেল অর্কিড ব্লু-এর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাদের হোটেলে ২৪ জন চীনা নাগরিক ছিলেন। তাদের বিষয়ে চুক্তিপত্রসহ সব কিছু ডিজিএফআইসহ সংশ্লিষ্টদের জানানো হয়েছিল। ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, ওরা চীনা নাগরিক; আমাদের হোটেলে থাকতেন। এখানে তারা কোনো কাজকর্ম করতেন না। শুনেছি, অন্য কোনো হোটেলে নাকি কম্পিউটার ল্যাব করেছেন।







আরও পড়ুন
মালয়েশিয়ায় অবৈধ বাংলাদেশিদের কঠোর সতর্কবার্তা
লক্ষ্মীপুরে পানিতে ডুবে নাতি-নাতনিসহ বৃদ্ধের মৃত্যু
বাড্ডায় ফার্নিচারের গোডাউনে আগুন